৩রা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৫ই শাওয়াল, ১৪৪৬ হিজরি

আধুনিক অর্থনীতির রুপকার এম. সাইফুর রহমান-সালেহ আহমদ হোসাইন

admin
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৪, ০৭:২১ অপরাহ্ণ
আধুনিক অর্থনীতির রুপকার এম. সাইফুর রহমান-সালেহ আহমদ হোসাইন

এম সাইফুর রহমান শুধু একজন মানুষের নাম নয়। সাইফুর রহমান ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, সাইফুর নামীয় একটি ইউনিভার্সিটি। সেই সাইফুর নামীয় প্রতিষ্ঠানের জন্ম ঐতিহাসিক মৌলভীবাজার জেলার বাহার মর্দান গ্রামে ১৯৩২ সালের ৬ অক্টোবরে । তাঁর পিতা মোহাম্মদ আবুল বাছির, মাতা- তালেবুন নেছা। সাইফুর রহমান ছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। তিনি যখন মাত্র ছয় বছরের ছোট্ট একটি বালক তখন তার বাবা মারা যান। চাচা মোহাম্মদ সফি তার অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। গ্রামের মক্তব থেকে বাল্য শিক্ষা শেষ করে ১৯৪০ সালে জগৎসী গোপালকৃষ্ণ ইংরেজী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই স্কুলে দুই বছর অধ্যয়ন করে মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এই বিদ্যালয় থেকেই ১৯৪৯ সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সহিত উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি এম.সি কলেজে আই.কম এ ভর্তি হন। তিনি এস.এম হলের একজন আবাসিক ছাত্র ছিলেন।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে আশা-আকাঙ্খা উচ্ছাসের সৃষ্টি হয়েছিল, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত জনদের মধ্যে। কয়েক বছর যেতে না যেতেই বাংলার মানুষ বুঝতে পারে যে পশ্চিমা নেতাদের পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নের ব্যাপারে কোন আগ্রহ নেই। তৎকালীন সময়ে আরও স্পষ্টতর হয়ে ওঠে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষাকে তারা দমিয়ে রাখার জন্য খুব তৎপর হয়ে ওঠে, আর এ কারণে বাঙালীরা বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা করার দাবীতে তৎপর হয়ে ওঠে। আর এ দাবী বাস্তবায়নের জন্য তৎকালীন ছাত্র সমাজ বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে।

তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এম. সাইফুর রহমান দলীয় ছাত্র রানীতিতে জড়িত না থাকলেও মাতৃভাষা রক্ষার প্রত্যেকটি আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়েছিলেন। বাঙালীর ঐতিহাসিক ২১শে ফেব্রুয়ারীতে তিনি মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রয়ারী ছাত্র নেতৃবৃন্দ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচীর ডাক দিলে সাইফুর রহমান অংশগ্রহণ করেন এবং ২৫শে ফেব্রয়ারী তিনি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। তৎকালীন সরকার ঘোষণা করেছিল, যারা মুচলেকা প্রদান করবেন তাদেরকে মুক্তি দেয়া হবে। আত্মমর্যাদাবান বাঙালি প্রেমিক, দেশপ্রেমিক, সাইফুর রহমান বিশ্বাস করতেন, ভাষা আন্দোলন বাঙালীর ন্যায্য হিস্যা আদায়ের আন্দোলন। এই সংগ্রাম বাঙালির দাবী আদায়ের সংগ্রাম। তিনি তখন তৎকালীন সরকারের কাছে নতি স্বীকার করেননি। অনেকে তখন মুচলেকা দিয়ে কারামুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সাইফুর রহমান সরকারকে মুচলেকা দিতে অস্বীকার করেন।

সাইফুর রহমান ছিলেন প্রখর আত্মমর্যাদাবান এক সাহসী মানুষ। সেজন্য তিনি কখনও জেল-জুলুম কে ভয় পাননি। পরে তিনি স্বাভাবিক নিয়মে জেল থেকে মুক্তি পান। ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদান রাখার জন্য ২০০৫ সালে তিনি অত্যন্ত মযার্দাপূর্ণ একুশে পদক লাভ করেন। দেশ, বিদেশে তিনি অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। আমার মনকে আমি প্রশ্নবিদ্ধ করি আমরা কেন জাতি হিসেবে এত সংকীর্ণমনা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধিন সরকার খুব ছোট মনের পরিচয় দিয়েছিল, বাংলাদেশের হাতে গোনা কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে সাইফুর রহমান ছিলেন একজন, যিনি বাঙালির দাবী আদায়ের জন্য আহত হন এবং কারাবরণও করেছিলেন। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রাণ পুরুষ গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী সেই সাইফুর রহমানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দিয়ে।

সাইফুর রহমান ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রী অর্জন করেন। সে সময়ে মেধাবী ছাত্রদের ন্যায় তারও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অভিলাষ ছিল, সুপরিয়র সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে সরকারী আমলাতন্ত্রে যোগ দেয়া। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি গ্রেফতার হওয়ার পরে সিএসপি হওয়ার বাসনা মন থেকে মুছে ফেলেন। তিনি ব্যারিস্টারী পড়ার জন্য লন্ডনে চলে যান, কিন্তু লন্ডনে পৌছার পর তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে চাটার্ড একাউন্টেন্স পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৫৩-৫৮ সালে পড়াশোনার পর ১৯৫৯ সালে ইনষ্টিটিউট অব চার্টাড একাউন্ট্যান্স ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস এর ফেলোশীপ অর্জন করেন। তিনি আর্থিক ও মুদ্রানীতি এবং উন্নয়ন অর্থনীতিতে বিশেষ শিক্ষা অর্জন করেন। সাইফুর রহমান দেশে ফিরে এসে পাকিস্তান অক্সিজেন কোম্পানীতে যোগদান করেন। কিন্তু চাকুরীর প্রতি তার মোটেই মোহ ছিলনা। মাত্র দুই বছর চাকুরী করার পর তিনি এবং তার আরও দুই বন্ধু মিলে একটি চাটার্ড একাউন্টেন্স ফার্ম গড়ে তুলেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অনুরোধে সাইফুর রহমান জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে যুক্ত হন।

জিয়াউর রহমানের অনুরোধে এম. সাইফুর রহমান ১৯৭৬ সালে বাণ্যিজ্য উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর মন্ত্রীসভায় যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি বাণিজ্য মন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ১৯৭৯ সালে মৌলভীবাজার সংসদীয়-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনে সাইফুর রহমানের ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে সাইফুর রহমান সরকারের মন্ত্রী সভায় অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সাথে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৬ সালে তিনি আবার মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে মৌলভীবাজার-৩ এবং সিলেট (সদর-কোম্পানীগঞ্জ)-১ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। পরে তিনি মৌলভীবাজার-৩ আসন ছেড়ে দিলে তার বড় পুত্র এম নাসের রহমান উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পরে সাইফুর রহমান তখন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি মহান জাতীয় সংসদে ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশ করে কৃতিত্বপূর্ণ রেকর্ডের অধিকারী হন। তার এই সময়কালে ব্রিটিশ সরকারের উন্নয়নকেও হার মানিয়ে তিলে তিলে সিলেটকে রূপনগরী হিসেবে গড়ে তুলেন। সিলেট শহরের যে কোন স্থানে তাকালে সাইফুর রহমান এর উন্নয়নের কীর্তি দেখা যায়। তিনি তাঁর উন্নয়ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের কাছে, বিশ্বের মানুষের কাছে উন্নয়নের বরপুত্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন।

মনীষির ভাষায় কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। মানুষ বাঁচে তার কর্মের মধ্যে বয়সের মধ্যে নয়। এই কথাটি সাইফুর রহমান তার বর্ণাঢ্য জীবনে প্রতিফলিত করেছেন। তিনি একমাত্র বাংলাদেশী যিনি ইন্টারন্যাশনাল মনিটরিং ফান্ড (আই.এম.এফ) ও বিশ্ব ব্যাংকের বোর্ড অব গভর্ণরস-এর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং এই দুই প্রতিষ্ঠানের ৫০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ১৯৯৪ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত মাদ্রিদ সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন।

জননন্দিত নেতা এম. সাইফুর রহমান বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় ইস্যু নিয়ে অসংখ্য অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সাইফুর রহমান মৃত্যুকে জয় করার জন্য অনেক কাজ করে গেছেন। যার ফলে তিনি আজ কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। সাইফুর রহমানকে আমি কাছ থেকে দেখে, মিশে উপলব্ধি করেছি, তিনি সব সময় কিভাবে দেশের উন্নয়ন ও সিলেটের উন্নয়ন করা যায় তা নিয়ে সর্বদা গভীর ভাবে ভাবতেন। তার উন্নয়ন কর্মকান্ড দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। সাইফুর রহমান যে শুধু একজন অর্থমন্ত্রী ছিলেন তা কিন্তু নয় তিনি একজন দানবীরও ছিলেন।

আজ ৫ই সেপ্টেম্বর বিশ্ব অর্থনীতির বরপুত্র আলহাজ্ব এম. সাইফুর রহমান এর ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি গত ২০০৯ সালের এই দিনে কোটি কোটি বাঙালিকে শোকাহত করে চলে গেছেন পরপারে।

এম. সাইফুর রহমানের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি যে তিনি যেন, আজীবন মানুষের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ সাইফুর রহমানকে বেহেস্তের সর্বোচ্চ স্থানে রাখেন। -আমীন

 

লেখক : সালেহ আহমদ হোসাইন

সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

প্রতিষ্টাতা আহবায়ক: এম. সাইফুর রহমান স্মৃতি সংসদ

 

Sharing is caring!